
মোঃ রাসেল সরকার;
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমসাময়িক জাতীয় রাজনীতিতে এক অনন্য ধৈর্যশীল, ত্যাগী ও সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং বিশেষ করে বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপির কঠিনতম সময়ে দলের হাল ধরে রাখা, বারবার কারাবরণ ও শত মামলার মুখোমুখি হওয়া তার রাজনৈতিক ত্যাগের ইতিহাসের প্রধানতম দিক। শত উসকানি, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও রাজনৈতিক চাপের মুখেও তিনি তার মার্জিত ভাষা ও অহিংস রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখে বাংলাদেশের রাজনীতিতে “ভদ্র রাজনীতির প্রতীক” হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক ও পারিবারিক শিকড় অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তার পিতা মরহুম মির্জা রুহুল আমিন (যিনি এলাকায় ‘চোখা মিয়া’ নামে পরিচিত ছিলেন) মুসলিম লীগ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ঠাকুরগাঁও পৌরসভার ওয়ার্ড কমিশনার ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় অঞ্চলে স্পষ্টভাষী ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন ভূমিকার জন্য তাকে ‘চোখা’ (ধারালো) বলা হতো। মির্জা পরিবার ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের গোড়াপত্তন থেকেই ব্যবসা ও সমাজসেবায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে; ঠাকুরগাঁওয়ের প্রথম পেট্রোল পাম্প ও ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হল ‘বলাকা টকিজ’-এর মালিকানা এই পরিবারের সঙ্গেই যুক্ত।
পিতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র থাকাকালীন ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬০-এর দশকে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য, এসএম হলের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনের অধীনে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এসএ বারী অত-এর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর এসএ বারী পদত্যাগ করলে মির্জা ফখরুল শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান এবং নিজ শহর ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে এরশাদ সরকারের আমলে তিনি শিক্ষা বিভাগের ডিজি (মহাপরিচালক) এবং পরিদর্শন ও আয়-ব্যয় পরীক্ষণ অধিদপ্তরে অডিটর হিসেবেও সরকারি দায়িত্ব পালন করেছেন।
পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিতে এবং স্থানীয় রাজনীতির হাল ধরতে শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নিয়ে তিনি ১৯৮৯ সালের পৌরসভা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন এবং ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং দলীয় মনোনয়ন লাভ করেন। তার দুঃসম্পর্কের চাচা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা গোলাম হাফিজ তাকে রাজনীতিতে নানাভাবে সহযোগিতা করেন। ঠাকুরগাঁও পৌরসভার সফল চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান পোক্ত করেন এবং পরবর্তীতে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০১১ সালে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ইন্তেকালের পর মির্জা ফখরুল ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওই সময় দলের শীর্ষ নেতৃত্ব মামলা-হামলায় জর্জরিত ও বিপর্যস্ত ছিল। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে তিনি দলটির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হন। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাবন্দী ও পরবর্তীতে গৃহবন্দী থাকা এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সুদূর লন্ডনে অবস্থান করার কারণে দলটি যখন চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, তখন মির্জা ফখরুল এককভাবে সারা দেশের নেতাকর্মীদের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের চাঙ্গা রাখা, আইনি লড়াই পরিচালনা করা এবং শত প্রতিকূলতার মাঝেও দলকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে তার নেতৃত্ব ছিল দূরদর্শী ও অবিচল।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তার বিরুদ্ধে মামলার পাহাড় জমে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এক সমাবেশে তিনি নিজেই রসিকতা করে বলেছিলেন, “আমার নামে ৯৮টি মামলা হয়েছে, আর দুটি হলে সেঞ্চুরি হবে”, যা পরবর্তীতে বাস্তবে রূপ নেয় এবং তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলার সংখ্যা একশ ছাড়িয়ে যায়। গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, পুলিশের কাজে বাধা ও নাশকতার মতো গায়েবি অভিযোগে তাকে নিয়মিত আদালতের বারান্দায় হাজিরা দিতে হয়েছে।
বিগত দেড় দশকে তাকে অন্তত ১১ বার কারাবরণ করতে হয়েছে। বিশেষ করে—২০১২-২০১৩ সালে সরকারবিরোধী তীব্র আন্দোলন চলাকালে এবং ২০২২ সালের ডিসেম্বর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সংঘর্ষের পর গভীর রাতে তাকে বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশের পরদিন ২৯ অক্টোবর ভোরে তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়। প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলাসহ মোট ১১টি রাজনৈতিক মামলায় তাকে আসামি করে সাড়ে তিন মাসেরও বেশি সময় কারাগারে আটকে রাখা হয় এবং তিনি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জামিনে মুক্তি পান।
কারাগারে দীর্ঘ সময় কাটানো এবং আদালতের নিয়মিত হাজিরা ও ধকলের কারণে প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। তার ঘাড়ে ক্যারোটিড আর্টারিতে ব্লক ধরা পড়ায় তাকে বিদেশে গিয়ে অস্ত্রোপচার করাতে হয়। এছাড়া তিনি হৃদরোগ ও বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। চিকিৎসকরা তাকে ধকলমুক্ত ও বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিলেও, তিনি অসুস্থ শরীর নিয়েই রাজপথের আন্দোলন এবং দলের নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। সরকারের কোনো ধরনের চাপ, লোভ বা প্রলোভনের কাছে তিনি কখনো মাথা নত করেননি। ক্ষমতার মোহাচ্ছন্ন রাজনীতির বাইরে থেকে রাজপথের আন্দোলন, নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো এবং আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামে তার এই ত্যাগ ও অবিচল নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
বিঃদ্রঃ
প্রিয় এই নেতার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে দেশবাসীর কাছে তার জন্য ফরিয়াদ—মহান রাব্বুল আলামিন তাকে নেক হায়াত দান করুন।
লেখক:
মোঃ রাসেল সরকার
(সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী এবং চেয়ারম্যান, যুব-শক্তি সামাজিক আন্দোলন “বাংলাদেশ”)।
Leave a Reply