
মোঃ রাসেল সরকার;
সারা দেশজুড়ে বর্তমানে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে এক ভয়াবহ সংকট চলছে, যার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে অবৈধ সংযোগকে। বাংলাদেশের মোট জ্বালানির প্রায় পুরো অংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা সরাসরি আমাদের দেশীয় বাস্তবতায় প্রতিফলিত হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ ঘাটতি, শিল্প উৎপাদনে বিঘ্ন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি একে একে সামনে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে “সংকট ও সংকীর্ণতা”—শুধু জ্বালানি নয়, বরং নীতি, কৌশল এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের সামনে এক বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ভূ-রাজনীতি এবং জ্বালানি বাস্তবতায় বাংলাদেশে যেসব বিষয় প্রতিফলিত হচ্ছে, তার মধ্যে দেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় তিন দিক দিয়েই ভারতবেষ্টিত এই বাস্তবতায় জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমরা এক জটিল সমীকরণের মুখোমুখি। দেশের মোট শক্তির চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর। একটি দেশপ্রেমিক সরকারের দাবি করা সত্ত্বেও ভারতের চাপে ‘অয়েল টার্মিনাল’-এর পরিবর্তে ‘পাইপলাইন’ নির্মাণ করতে হয়েছে। এর ফলে নিজস্ব রিজার্ভ বা মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর চেয়ে প্রতিবেশী দেশের মজুতের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা আরও বেড়ে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদী সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বর্তমানে সারা বিশ্ব এক নজিরবিহীন জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; এটি কেবল বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়। আমেরিকার বাজারে তেলের দাম গ্যালনপ্রতি ১ ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি সমৃদ্ধ চীন চার বছরের মধ্যে ব্যক্তিগত জ্বালানি ব্যবহারে সর্বোচ্চ সীমা (Cap) আরোপ করেছে। ভিয়েতনাম জ্বালানি সাশ্রয়ে ‘হোম অফিস’ ব্যবস্থা চালু করেছে। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের পরিস্থিতি সবারই জানা। এমনকি সিরিয়ার মতো তেল উৎপাদনকারী দেশেও পাম্পে মারামারি ও হাহাকারের খবর আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আসছে। এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশের একটি বড় অংশ যখন আমদানিনির্ভর, তখন পেট্রোল পাম্পের লাইনের ছবি দিয়ে সস্তা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা কেবল দেউলিয়াপনা ছাড়া আর কিছুই নয়। জ্বালানি হলো একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার ‘লাইফলাইন’। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, স্পট মার্কেট থেকে প্রতিযোগিতামূলক দামে গ্যাস কেনার সক্ষমতা বা ‘বিডিং ক্যাপাবিলিটি’ আমাদের নেই।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো নেতৃত্বের অভাব। বর্তমান সময়ে যখন জাতিকে কৃচ্ছ্রসাধন করার কথা বলা দরকার, তখন বিনোদন কেন্দ্রের বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বালানি পুড়িয়ে অপচয় করা একটি জনতাকে শাসন করার মতো সাহসী নেতৃত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই ‘টক্সিক’ এবং অজ্ঞ মানসিকতার জনগোষ্ঠী বৃহত্তর সংকটের চেয়ে নিজেদের ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে তাকাতে পারছে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা সারাদিন ভারত-বিরোধী বা পাকিস্তান-পন্থী তকমা দিয়ে রাজনীতি করে, তাদের উদ্দেশ্যে চ্যালেঞ্জটি বেশ জোরালো। ফেসবুকের কিবোর্ডে দেশপ্রেম না দেখিয়ে যদি প্রকৃত অর্থেই কোনো শক্তিশালী, স্বাধীনচেতা এবং দৃঢ়চেতা নেতৃত্ব থাকত, তবে ৫ আগস্টের মতো গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাদের আনতে জনগণ দ্বিধা করত না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যাদের বিকল্প হিসেবে ভাবა হচ্ছে, তারাও পর্দার আড়ালে একই শক্তির সাথে গোপন মিত্রতা বজায় রেখে চলছে।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া খবর যে ইরান বাংলাদেশের জাহাজ ছেড়ে দিচ্ছে, তার বাস্তব ভিত্তি কতটুকু তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। প্রকৃত তথ্য হলো, ইস্টার্ন রিফাইনারির তেল শোধনের সক্ষমতা ফুরিয়ে আসছে, কারণ সৌদি আরব থেকে তেলের সরবরাহ আপাতত স্থগিত রয়েছে। কুয়েত থেকে আসা ১ লাখ ব্যারেল তেলের জাহাজটি কবে পৌঁছাবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমন এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে একটি দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। ভারতপন্থী বা অন্য কোনো শক্তির লেজুড়বৃত্তি করা সরকারের পরিবর্তন কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং কঠোর বাস্তবতা এবং সক্ষম নেতৃত্বের মাধ্যমেই হওয়া উচিত। সংকীর্ণ রাজনৈতিক বিদ্বেষ বাদ দিয়ে দেশের প্রকৃত জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্ব নিয়ে ভাবার সময় এখনই। যারা নিজেদের দেশপ্রেমিক দাবি করেন, তাদের উচিত ভূ-রাজনীতির জটিলতা বুঝে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সাহসী নেতৃত্ব গড়ে তোলা, অন্যথায় কেবল ক্ষমতার পালাবদলই ঘটবে, ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না।
বর্তমানে এক ভয়াবহ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ সংকট চলছে। এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে অবৈধ সংযোগ এবং অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ব্যবহার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক সংলাপে এই সংকট ও এর পেছনের কারণগুলো বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। ‘গরিবের টেসলা’খ্যাত লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক গভীর রাতে একযোগে চার্জ দেওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। অতীতে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা বা পিক আওয়ার সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১২টার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, বর্তমানে মধ্যরাতেও বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছুঁয়ে ফেলছে। অধিকাংশ অটোরিকশা গ্যারেজ এবং চার্জিং পয়েন্ট অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যা জাতীয় গ্রিডের শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ নষ্ট করছে। মহেশখালীর এলএনজি ভাসমান টার্মিনালে আগুন লাগা এবং কারিগরি ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকের নিচে (২০৩ কোটি ঘনফুট) নেমে এসেছে। এছাড়া বৈরী আবহাওয়ায় এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি সংকটে দেশের ইতিহাসে মধ্যরাতে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও ঘাটতি বা লোডশেডিং ৩,৫৯২ মেগাওয়াত ছাড়িয়ে গেছে।
গ্রামাঞ্চলে দিনে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এই তীব্র অসন্তোষের কারণে দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপকেন্দ্র ও কার্যালয়গুলোতে হামলার আশঙ্কায় পুলিশি নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে। গ্রামের মানুষের ভোগান্তি কমাতে বর্তমানে ঢাকাতেও এলাকাভিত্তিক নিয়মিত লোডশেডিং শুরু হয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা নিয়ে ব্যবসায়ীরা চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যৌথ উদ্যোগে অবৈধ গ্যারেজ ও বিদ্যুৎ চুরির সিন্ডিকেট রুখতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে অভিযান চালাতে গিয়ে বিদ্যুৎ কর্মীরা স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহলের বাধার মুখে পড়ছেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে হামলার শিকার হচ্ছেন। নতুন সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সারা দেশের শপিং মল, বিপণিবিতান ও দোকানপাট রাত ৮টার মধ্যে অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। সমস্ত জাঁকজমকপূর্ণ আলোকসজ্জা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং আলোকিত বিলবোর্ড সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ভবনের প্রশাসনিক গতি বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী সকাল ৯টায় কার্যালয়ে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করেছেন এবং দুর্যোগকালীন পরিস্থিতির মতো কর্মকর্তাদের ২৪ ঘণ্টা সতর্ক রাখা হয়েছে। সিপিডির সংলাপে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “ব্যবসায়ীরা যে সুদের বোঝা আর গ্যাস-বিদ্যুতের অভাব নিয়ে কষ্টে আছেন, তা আমি খুব ভালো করেই বুঝি। রাজনীতির পূর্ণাঙ্গ আঙিনায় আসার আগে আমিও আপনাদের সারিতেই বসেছিলাম। তাই কোনো মনগড়া আশ্বাস আমি দেব না। বিদেশি প্রকৌশলীরা যতক্ষণ পর্যন্ত এফএসআরইউ মেরামত শেষ না করছেন, ততক্ষণ অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো গতি নেই।”
সংকট উত্তরণে এবং জ্বালানি খাতের টেকসই রূপান্তরের জন্য সরকার বেশ কিছু দূরদর্শী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের সৌর বিদ্যুৎ থেকে ৫,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আগামী ৩ মাসের মধ্যে দেশের সব ডিসি অফিসে সোলার প্যানেল স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে ২০২৯ সালের মধ্যে পায়রা, মোংলা এবং হিরন পয়েন্টে তিনটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং ইতিমধ্যে একটি নতুন এফএসআরইউর অর্ডার দেওয়া হয়েছে। অবৈধ লোড ও অটোরিকশার অতিরিক্ত চাপ সামলাতে জাতীয় গ্রিডকে স্মার্ট গ্রিডে রূপান্তরের জন্য বিদেশি সংস্থার সাথে যৌথ বিনিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমান সংকটটি একটি কাঠামোগত ও সাময়িক প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের ফল। বিদেশি প্রকৌশলীদের মাধ্যমে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল মেরামত সম্পন্ন হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত সুশৃঙ্খল লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং সর্বস্তরের সচেতনতাই এই সংকট উত্তরণের একমাত্র উপায়।
লেখক:
মোঃ রাসেল সরকার
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
চেয়ারম্যান, যুব-শক্তি সামাজিক আন্দোলন “বাংলাদেশ”
Leave a Reply