
মোঃ রাসেল সরকার: রাজধানীর ফুটপাত, কাঁচাবাজার, পরিবহন, অটোরিকশা, নদীর ঘাট ও ময়লা ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান—প্রায় প্রতিটি খাতেই ছড়িয়ে পড়েছে সর্বগ্রাসী চাঁদাবাজি। আগে শীর্ষ সন্ত্রাসী বা মাফিয়া গডফাদারদের আধিপত্য থাকলেও বর্তমানে টোকাই থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের নব্য চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে রাজধানীবাসী পুরোপুরি জিম্মি হয়ে পড়েছে। চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে লাগাতার হত্যাকাণ্ড ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তি ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েছেন।
চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নমনীয়তা এবং অপরাধীদের দমনে দৃশ্যমান ব্যর্থতার কারণে মোহাম্মদপুর, মিরপুর, পল্লবী, ভাষানটেক, কেরানীগঞ্জ ও যাত্রাবাড়ীর মতো এলাকাগুলো সাধারণ মানুষের জন্য চরম আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। বাড়ি নির্মাণ, ব্যবসা শুরু কিংবা মাছ ধরার মতো সাধারণ কার্যক্রমেও চাঁদা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
এমনকি চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রকাশ্যেই খুনের শিকার হচ্ছেন রাজনৈতিক কর্মীরা। গত এক বছরের মধ্যে পল্লবীতে যুবদল নেতা ইউসুফ ও গোলাম কিবরিয়া, কারওয়ান বাজারে স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বির এবং মৌচাকে বেল্লাল হোসেনের মতো আলোচিত হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যেও ছিল চাঁদাবাজি।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত দেশে চাঁদাবাজির ঘটনায় ৬৯৬টি মামলা হয়েছে এবং ৮২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চার মাসে রাজধানীতে চাঁদাবাজির ঘটনায় ২৩৬টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ৪২টি, মার্চে ৫৮টি, এপ্রিলে ৭১টি এবং মে মাসে ৬১টি মামলা দায়ের হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রতিদিনের আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ চাঁদা হিসেবে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মারধর, ভীতি প্রদর্শন, ব্যবসা দখল বা স্থানচ্যুত করার মতো ঘটনা ঘটছে।
যাত্রাবাড়ী এলাকায় প্রায় ২০ বছর ধরে মাছ বিক্রি করা জাকির হোসেন চলতি বছরের এপ্রিল থেকে আর ব্যবসা করতে পারছেন না। নতুন করে দোকানের দখল রাখতে প্রায় ১৫ লাখ টাকা এবং প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাকে স্থান ছাড়তে বাধ্য করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশের তথ্যমতে, যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন খাতে এক প্রভাবশালী নেতার আশ্রয়ে শতাধিক চাঁদাবাজ সক্রিয় রয়েছে। সায়দাবাদ, জনপদের মোড় ও ধলপুর এলাকায় পরিবহন, বাজার ও ফুটপাতকেন্দ্রিক প্রতিটি পরিবহন থেকে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যা স্থানীয় প্রভাবশালী থেকে পুলিশ পর্যন্ত ভাগ-বাটোয়ারা হয়।
নিউমার্কেট এলাকায় দোকান দখল, ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ বিল, পার্কিং ফি ও মাসিক ভাড়ার নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। অনেক হকারকে দিনে চারবার পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিউমার্কেট থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি মকবুল ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী চাঁদাবাজিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সিটি করপোরেশনের লোগোযুক্ত ভুয়া রসিদে ফুটপাতে পার্কিং ফি এবং প্রতিটি দোকান থেকে বিদ্যুৎ বিল বাবদ আড়াই হাজার টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া ১৫০টি দোকান দখল করে প্রতিটির মাসিক ভাড়া ২০ হাজার টাকা এবং অগ্রিম তিন লাখ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে নিউমার্কেটের ফুটপাত থেকেই প্রতিদিন কমপক্ষে ছয় লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়।
আরামবাগ, এজিবি কলোনি ও কমলাপুর এলাকায় আরামবাগ, এজিবি কলোনি ও কমলাপুর এলাকায় বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, পরিবহন কাউন্টার ও ফুটপাতের দোকান ঘিরে অবৈধ চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রায়ই স্থানীয় সূত্রে ও গণমাধ্যমে উঠে আসে। মতিঝিলের আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী বাপ্পি কারাগারে থাকলেও বহাল তবিয়তে রয়েছে চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে সকল সন্ত্রাসী কার্যক্রম। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, এ সকল সন্ত্রাসী কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন সোহেল শরিফ লাবুসহ শ্রমিক দলের আরও কয়েকজন নেতাকর্মী। তারা বিএনপির অঙ্গসংগঠন শ্রমিক দলের নাম ভাঙিয়ে এসব সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। আরামবাগ ও কমলাপুর এলাকার বিভিন্ন দূরপাল্লার বাস কাউন্টার থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে সোহেল শরিফ লাবুর বিরুদ্ধে। স্থানীয় দোকানপাট, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়মিত চাঁদা নেওয়া হয়। এলাকার ফুটপাত দখল করে বসা ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের কাছ থেকেও দৈনিক বা মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা আদায় করা হয়। সাধারণ ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসী এই ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর হস্তক্ষেপ ও নজরদারি দাবি করে আসছেন।
গত ২৯ জুলাই মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সবুজবাগে এক বিএনপি কর্মী ও হাজারীবাগে এক তরুণ নিহত হওয়ার ঘটনায় রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ডিএমপির সূত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাজধানীতে ১২২২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে (গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২০ জন)। পুলিশের তদন্তে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দখলবাণিজ্য ও চাঁদাবাজির তথ্য উঠে এসেছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের ৩৮ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির ২১ জন, যুবদলের আটজন, ছাত্রদলের দুজন, শ্রমিক দলের দুজন, কৃষক দলের দুজন, স্বেচ্ছাসেবক দলের দুজন এবং তাঁতীদলের একজন রয়েছেন। একই সময়ে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সারা দেশে মোট ১ হাজার ৯১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
নেপথ্যে প্রভাবশালী ও রক্ষকদের ভূমিকা
গোয়েন্দা সংস্থা, ডিএমপি, পুলিশ সদর দপ্তর এবং স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রায় ১ হাজার ২০০ চাঁদাবাজের সঙ্গে তাদের আশ্রয়দাতা হিসেবে ৩২৯ জন প্রভাবশালী নেতার নাম উঠে এসেছে। এর মধ্যে ২১৭ জনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা রয়েছে (২১৪ জন বিএনপির, দুজন আওয়ামী লীগের এবং একজন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা)। এছাড়া মিরপুর, উত্তরা, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট ও শাহ আলীর বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে ৩৫টি জায়গায়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সরকার পতনের পর ঢাকা শহরের আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে থাকা ৫৩টি পরিবহন টার্মিনাল ও স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ২১ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া শিল্পাঞ্চলেও ঝুট ব্যবসা ও কারখানার পণ্যবাহী যানবাহন থেকে নিয়মিত চাঁদা নেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধবিজ্ঞানী তৌহিদুল হক জানান, ফুটপাত, ময়লা-বাণিজ্য, পরিবহন ও দখল ব্যবসার মতো বেআইনি অর্থনৈতিক খাতগুলোর নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ছে। এসব খাতের অবৈধ নিয়ন্ত্রণ বন্ধ, আইনের শাসন নিশ্চিত এবং প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ বিচার করা না গেলে সহিংসতা ও জনমনে উদ্বেগ আরও বাড়বে।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ফুটপাত, সরকারি জমি, খাল, জলাশয়, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান দখল করে একটি শক্তিশালী নগর মাফিয়াতন্ত্র গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও পেশিশক্তির কারণে এই দখলদারি টিকে আছে, যা পরিকল্পিত নগর উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই পরিস্থিতি উত্তরণে সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণসহ সাত দফা সুপারিশ করেছে আইপিডি।
Leave a Reply