
— মোঃ রাসেল সরকার
দেশের বাইরে বসে প্রযুক্তির সহায়তায় বেতনভুক্ত শুটার ও স্থানীয় ক্যাডারদের মাধ্যমে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং খুনখারাবির মতো অপরাধ পরিচালিত হচ্ছে। মালয়েশিয়া, দুবাই, ইউরোপ, আমেরিকা ও সুইডেনে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এই নেটওয়ার্কের মূল চালিকাশক্তি। গোয়েন্দা রিপোর্ট ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এই অপরাধ জগতের একটি বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণ এখনো বজায় রেখেছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ।
মূলত দুবাই ও এর আশপাশের এলাকায় পলাতক থেকে জিসান রামপুরা, বাড্ডা, গুলশান, মতিঝিল ও মালিবাগ এলাকার অপরাধ নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে আসছেন। তিনি বিদেশে বসে টার্গেট নির্ধারণ করে চাঁদার দাবি জানান এবং চাঁদা না পেলে দেশে থাকা অনুগত ক্যাডারদের দিয়ে হত্যাকাণ্ড বা সহিংসতা ঘটান। ২০০৩ সালে মালিবাগে ডিবি পুলিশ কর্মকর্তা হত্যার পর তিনি দেশ ছেড়ে প্রথমে ভারত ও পরে দুবাই চলে যান। দুবাইয়ে তিনি 'আলী আকবর চৌধুরী' নামে ভারতীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করে পরিচিত ছিলেন। ইন্টারপোলের রেড নোটিশভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও আইনি মারপ্যাঁচ, জামিন এবং বন্দি বিনিময় চুক্তির জটিলতার কারণে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান একটি বড় রহস্য। গোয়েন্দাদের ধারণা, তিনি দুবাই কিংবা ছদ্মনামে লন্ডন বা ইউরোপের অন্য কোনো দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় অথবা অবৈধ কাগজপত্রের মাধ্যমে অবস্থান করছেন।
জিসান ছাড়াও মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রবিন ও ডালিম, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল এবং সুইডেনে থাকা নাহিদ নিজ নিজ অবস্থান থেকে নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন। সম্প্রতি পুলিশের অভিযানে বাপ্পি আটক হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর, অপরাধের কৌশল রূপ বদল করে রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ড ব্যবহার করা হচ্ছে।
কৌশলগত পরিবর্তন এনে মতিঝিল, আরামবাগ, এজিবি কলোনি, ফকিরাপুল, শাহজাহানপুর, মালিবাগ, সবুজবাগ, খিলগাঁও, মুগদা, বাড্ডা ও রামপুরা এলাকায় অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
সূত্রে জানা যায়, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিএনপির সহযোগী সংগঠন শ্রমিক দলের সাইনবোর্ড লাগিয়ে শাজাহানপুর, খিলগাঁও, মতিঝিল, আরামবাগ, এজিবি কলোনি ও কমলাপুর এলাকায় ছদ্মবেশে এক শ্রমিক দলের নেতাসহ সোহেল, শরীফ ও লাবু নামক সন্ত্রাসীরা সক্রিয় রয়েছে। মতিঝিল, আরামবাগ, এজিবি কলোনি ও কমলাপুর এলাকার বিভিন্ন বাস কাউন্টার, ফুটপাত এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। আরামবাগ ও কমলাপুর এলাকার দূরপাল্লার বিভিন্ন পরিবহন কাউন্টার থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয় এবং এজিবি কলোনি ও আশেপাশের এলাকার ফুটপাত ও অস্থায়ী দোকান থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), সিটিটিসি এবং র্যাব নিয়মিত অভিযান ও তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজদের গ্রেফতারে তৎপর রয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
মতিঝিল থানাধীন সানমুন টাওয়ার এলাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা দাবির অভিযোগে সিটিটিসি কর্তৃক মো. কিরণ হোসেন (২৩) গ্রেপ্তার হন।
পল্টন থানা এলাকায় পুলিশের তালিকাভুক্ত ও সক্রিয় অস্ত্রধারী চাঁদাবাজ হিসেবে কাজী হাসিবুর রহমান এবং মুজাহিদুল ইসলাম সোহাগ-এর নাম এসেছে। এছাড়াও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগের ভিত্তিতে মতিঝিল থানায় বেশ কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ও স্থানীয় চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করা হয়েছে।
র্যাব ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) রাজধানী জুড়ে প্রায় সাড়ে ছয় শতাধিক চাঁদাবাজের একটি বিশেষ তালিকা তৈরি করেছে। মতিঝিল, কমলাপুর ও আরামবাগ জোনে ভাসমান দোকান, লেগুনা ও বাস কাউন্টারে চাঁদা তুলতে আসা "লাইনম্যান" এবং তাদের পেছনে থাকা স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অবস্থান শনাক্তকরণ এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা চলমান।