
সম্মানিত সুধী, আসসালামু আলাইকুম,
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, তার নাগরিকদের আত্মপরিচয় এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বহুলাংশে নির্ভর করে তার জাতীয়তাবাদী দর্শনের ওপর। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, এদেশের মানুষের রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তন কোনো একক সরলরেখায় চলেনি। বরং এটি মূলত তিনটি প্রধান জাতীয়তাবাদী স্রোতের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে—মুসলিম জাতীয়তাবাদ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। আজ এই নিবন্ধে এই তিনটি ধারার ঐতিহাসিক অনিবার্যতা, পারস্পরিক রূপান্তর এবং একটি সুষম সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলো।
আমাদের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মোড় ছিল বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মুসলিম জাতীয়তাবাদের উত্থান। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং তৎকালীন হিন্দু জমিদার, জোতদার ও মহাজনদের চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণের মুখে পূর্ব বাংলার মুসলিম কৃষক ও সাধারণ সমাজ নিজেদের অস্তিত্ব সংকটে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে ধর্মকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা 'দ্বি-জাতি তত্ত্ব' বা মুসলিম জাতীয়তাবাদ এদেশের মানুষকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম দেয়। ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে যে আন্দোলনের সূচনা হয়, তার ফলশ্রুতিতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। বস্তুনিষ্ঠভাবে বিবেচনা করলে, মুসলিম জাতীয়তাবাদ ছিল বাঙালি মুসলমানদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের প্রথম ধাপ, যা তাদের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ শোষণ থেকে মুক্তি দিয়েছিল। তবে এর মূল সীমাবদ্ধতা ছিল—কেবল ধর্মীয় মেলবন্ধন যে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের সব নাগরিকের গণতান্ত্রিক ও ভাষিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারে না, তা তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক ও আধিপত্যবাদী আচরণের কারণে দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোয় যখন আমাদের মাতৃভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি চরমভাবে আক্রান্ত হলো, তখন ধর্মের সংকীর্ণ দেয়াল ভেঙে জন্ম নিল 'বাঙালি জাতীয়তাবাদ'। এই মতবাদের মূল ভিত্তি ছিল—আমাদের প্রধান পরিচয় আমরা বাঙালি; আমাদের ভাষা বাংলা এবং আমাদের সংস্কৃতি হাজার বছরের সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য দ্বারা পরিপুষ্ট।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সব লড়াইয়ের মূল চালিকাশক্তি ছিল এই বাঙালি জাতীয়তাবাদ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে এই দর্শন একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র গঠনে গভীর অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে, এই নৃতাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ স্বাধীন বাংলাদেশে একটি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। তা হলো—বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে বসবাসকারী অ-বাঙালি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ (যেমন: চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারো ইত্যাদি) এই 'বাঙালি' পরিচয়ের বলয়ে নিজেদের স্বকীয়তা নিয়ে কিছুটা প্রান্তিক বোধ করতে পারে। ১৯৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের হাত ধরে 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ'-এর ধারণাটি সামনে আসে। এটি মূলত একটি ভৌগোলিক ও নাগরিক জাতীয়তাবাদ। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো—একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তার রাজনৈতিক পরিচয় কেবল কোনো নির্দিষ্ট একক ভাষা বা সংস্কৃতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। রাষ্ট্রকে তার ভৌগোলিক সীমানা এবং ভূখণ্ডের সব নাগরিকের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ তাত্ত্বিকভাবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিচয় তৈরি করে, যা বাঙালি এবং পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী উভয়কেই 'বাংলাদেশি' নামক একক রাজনৈতিক ছাতার নিচে নিয়ে আসে। একই সাথে, এটি এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যকে জাতীয় পরিচয়ের সাথে যুক্ত করে। তবে সমালোচকদের মতে, এই ধারা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কখনো কখনো মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের সাথে সমন্বয় সাধনে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়।
সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়নে দেখা যায়, এই তিনটি মতবাদের কোনোটিই একে অপরের সম্পূর্ণ শত্রু বা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এগুলো আমাদের জাতীয় বিবর্তনের একেকটি অনিবার্য ও পরিপূরক পর্যায়। মুসলিম জাতীয়তাবাদ আমাদের শিখিয়েছে নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ আমাদের দিয়েছে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক শিকড়, যা আমাদের স্বকীয়তার প্রধান ভিত্তি।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ আমাদের দিয়েছে একটি সার্বভৌম আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো, যা দেশের অভ্যন্তরে বৈচিত্র্য রক্ষা করে সব নাগরিককে একীভূত করে।
তাই আজ কোনো অপ্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত না হয়ে, আমাদের একটি বাস্তবসম্মত ও সুষম সমন্বয়ের দিকে এগোতে হবে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমরা গর্বিত বাঙালি, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধে আমরা আমাদের ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত শেকড়কে ধারণ করি এবং আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে আমরা সবাই এক ও অভিন্ন সার্বভৌম বাংলাদেশি। এই ত্রিমাত্রিক সত্যকে ধারণ করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের আজকের সর্বসম্মত অঙ্গীকার।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাঙালি, বাংলাদেশি ও মুসলিম জাতীয়তাবাদ—এই তিন ধারার ঐতিহাসিক সংযোগ অত্যন্ত গভীর। এই আত্মিক মেলবন্ধন ও সমন্বিত জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমেই কেবল ফ্যাসিবাদের শেকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনে এই ঐতিহ্যগত মেলবন্ধনকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে হবে।
ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটলেও এর দোসর ও ষড়যন্ত্র থেমে নেই। তাই এই শক্তির বিরুদ্ধে শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বার্থে বৃহত্তর ঐক্যের বিকল্প নেই। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে জনতার মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক বা বিভেদ সৃষ্টি না করে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সবসময় সতর্ক ও সোচ্চার অবস্থান বজায় রাখা। ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিরোধ কোনো সাময়িক আন্দোলন নয়, এটি একটি ধারাবাহিক সংগ্রাম। জনগণের সম্মিলিত জাগরণ ও ঐতিহাসিক জাতীয়তাবাদের মেলবন্ধনেই সুরক্ষিত হতে পারে আমাদের আগামীর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
ফ্যাসিবাদী মুর্দাবাদ
লেখক:
মোঃ রাসেল সরকার
সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ।
চেয়ারম্যান, যুব-শক্তি সামাজিক আন্দোলন "বাংলাদেশ"