
মোঃ রাসেল সরকার,
অন্যায় প্রত্যক্ষভাবে না করলেও কোনো অন্যায়কারীকে সমর্থন বা সহযোগিতা করা ইসলাম ধর্মে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহর সুনির্দিষ্ট বিধান এবং নৈতিক হুকুমের বাইরে গিয়ে আমি কখনো পেশাদারিত্ব বা আদর্শের সঙ্গে আপস করতে চাই না। সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি পবিত্র সামাজিক দায়িত্ব, মানবাধিকার রক্ষা এবং সত্যের পক্ষে অবিচল থাকার আপসহীন লড়াই।
"আর তোমরা জালিমদের (অন্যায়কারীদের) প্রতি ঝুঁকে পড়ো না, অন্যথায় তোমাদের আগুন স্পর্শ করবে।" — (সূরা হূদ, আয়াত: ১১৩)
আমরা কোনোকালেই ক্ষমতাসীন দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলে দালালিতে বিশ্বাসী নই! একজন সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী হিসেবে এটিই আমার মূল আস্থাসূচক অবস্থান। সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো সততা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা। ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতাধর মহলের তোষামোদ বা দালালি থেকে দূরে থেকে পেশাগত মর্যাদা বজায় রাখা একজন প্রকৃত সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় শক্তি। পেশাগত এই নীতি সাংবাদিকতাকে যেমন মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে, তেমনি সমাজে সত্য প্রকাশে গণমাধ্যমের ভূমিকাও জোরালো করে।
মনে রাখতে হবে—অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে কথা বলতে পারে না, সে হলো সমাজের আবর্জনা। আর শক্তিশালী ও প্রভাবশালী অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে যে সাহসের সঙ্গে রুখে দাঁড়াতে পারে, সেই প্রকৃত যোদ্ধা। জেল, জুলুম, নির্যাতন, হয়রানি, মামলা, হামলা কিংবা হত্যার হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে ছিলাম—কিংবা আজও আছি। আমি মোঃ রাসেল সরকার কখনোই অন্যায়ের কাছে মাথা নত করিনি, ভবিষ্যতেও করব না। সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য হলো জাতির সামনে নির্ভয়ে সত্য তুলে ধরা। আর আমি ঠিক সেই কাজটিই সততার সঙ্গে করে যাচ্ছি। আল্লাহ প্রদত্ত বিবেক এবং সাধারণ জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সমাজের অন্যায়-অবিচার দূর করা এবং সত্য প্রকাশ করাই আমার জীবনের মূল ব্রত। জাতীয় স্বার্থ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার এই লড়াইয়ে আমি অবিচল থাকতে বদ্ধপরিকর।
পবিত্র কুরআনে তথ্য যাচাই এবং সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সংবাদ যাচাইয়ের মূলনীতি (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৬): "হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও, পাছে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে বসো এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হও।"
শিক্ষা: সূত্রবিহীন বা সন্দেহভাজন উৎস থেকে প্রাপ্ত খবর প্রকাশ করার আগে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া বাধ্যতামূলক।
বস্তুনিষ্ঠ ও সঠিক কথা বলা (সূরা আল-আহজাব, আয়াত: ৭০): "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক ও সত্য কথা বলো।" শিক্ষা: সংবাদে কোনো ধরনের মিথ্যা, গুজব, অতিরঞ্জন বা চটকদার শিরোনাম দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা যাবে না। অনুমান ও না জেনে খবর ছড়ানোর নিষেধ (সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৬): "যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে পোড়ো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয়—এদের প্রত্যেকের কৈফিয়ত তলব করা হবে।" শিক্ষা: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অকাট্য তথ্য-প্রমাণ থাকা আবশ্যক। শুধু অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কারও চরিত্র হনন করা যাবে না।
কুৎসা রটানো ও উপহাস করার শাস্তি (সূরা আল-হুমাজাহ, আয়াত: ১): "ধ্বংস তাদের জন্য, যারা সম্মুখে ও পশ্চাতে মানুষের নিন্দা ও কুৎসা রটায়।" শিক্ষা: হলুদ সাংবাদিকতা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কারও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মানহানিকর সংবাদ প্রকাশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ন্যায়ের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইসলামের নির্দেশনা ইসলামে ন্যায়ের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, নিজের বা স্বজনদের বিরুদ্ধে গেলেও সত্যের পক্ষে থাকা (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৩৫): ন্যায়ের স্বার্থে কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্বের সুযোগ নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, "হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর ওয়াস্তে সত্য সাক্ষ্য দাও; তা যদি তোমাদের নিজেদের কিংবা পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধেও হয় তবুও।"
শত্রুর সাথেও ন্যায়বিচার করা (সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৮): ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা শত্রুতা যেন অন্যায় আচরণের কারণ না হয়। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দেন, "কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদের এমন উত্তেজিত না করে যে, তোমরা ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করবে। তোমরা ন্যায়বিচার করো, এটিই তাকওয়ার নিকটতর।" সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ (সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১১০): উম্মতে মুহাম্মদীর শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম মূল শর্ত হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়া। "তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ দেবে, অসৎ কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখবে।" সত্য ও মিথ্যাকে গুলিয়ে না ফেলা (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ৪২): জেনেবুঝে সত্য গোপন করা বা সত্যের গায়ে মিথ্যার প্রলেপ দেওয়া গুরুতর অপরাধ। "তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনেশুনে সত্যকে গোপন করো না।" জালিম বা অন্যায়কারীদের সহযোগিতা না করা (সূরা হূদ, আয়াত: ১১৩): অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অর্থ হলো অন্যায়কারীদের বয়কট করা। "আর তোমরা জালিমদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না, অন্যথায় তোমাদের আগুন স্পর্শ করবে।"
আমরা সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে জাতীয় স্বার্থ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার সুরক্ষায় সত্যের পক্ষে দাঁড়াই এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখি। একটি বিষয় যদি আপনি লক্ষ করে দেখেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের যে আকাঙ্ক্ষা মাত্র ৫০ দিনে মহান রব পূরণ করে দিয়েছেন—তা আমাদের নতুন করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পবিত্র বিধানের বাইরে গিয়ে আমি কখনো আমার পেশাদার ও নৈতিক অবস্থান থেকে একচুলও সরে দাঁড়াবো না। দেশ, মাটি ও মানুষের অধিকার আদায়ের এই লড়াই অব্যাহত থাকবে।
লেখক,
মোঃ রাসেল সরকার
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
চেয়ারম্যান, যুব শক্তি সামাজিক আন্দোলন "বাংলাদেশ"।